![]() |
সুরুচি ভ্যারাইটিজ স্টোর, মাগুরা, কুলাউড়া। আমার জীবনের বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। দোকানটির প্রতিষ্ঠাতা বাবু আমার সুহৃদবর। সেসময় ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস না থাকলে বাড়িতে চলে আসতাম, আর বাবু তখন ডাকতো তার দোকানে। আমার সাথে তখন বাবুর দোকানে আড্ডা দিতো আমাদের আরও এক মিত্র। সময়ের সাথে সাথে যার সাথে দুরত্বটা বেড়ে গিয়েছে অনেকখানি। ঠিক যেভাবে পরিবর্তন হয়েছে সুরুচি ভ্যারাইটিজ স্টোরের মালিকানাসত্ত্ব!
ঠিক পাঁচ বছর আগে, এমনই এক মুষলধারে বৃষ্টি হওয়া অক্টোবরের বিকেলে ছাতা নিয়ে পৌঁছালাম সুরুচি ভ্যারাইটিজ স্টোরে। বন্ধুদের গ্রোসারির দোকানে বসে আড্ডা দেয়ার মজাই আলাদা। ক্যাশবাক্সের পাশে বসে সামনের টেবিলে রাখা এটা ওটা হাত লাগিয়ে খাওয়া যায় ইচ্ছামতো।
সেদিনও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। আমি ক্যাশবাক্সর উপরে বয়ামে রাখা পিনাট বার হাতে নিয়ে খাওয়া শুরু করতেই বাবু বললো, কুলাউড়া নিয়ে কিছু একটা করা প্রয়োজন। আমিও পিনাট বারে মন ডুবিয়ে মাথা নাড়িয়ে সায় দিয়ে বললাম, হ্যাঁ।দেশ নিয়ে তো কিছু করতে পারছি না আপাতত, তাই কুলাউড়া নিয়েই শুরু করি। কিন্তু কী করা যায়, আইডিয়া আছে কোনো?
বাবু তার প্রজ্জ্বলিত চোখে আমাকে তখন বললো, কুলাউড়াকে প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটা ফেসবুক পেজ খুললে কেমন হয়। যেখানে কেবল কুলাউড়া নিয়েই কথা হবে। কুলাউড়ার বাইরে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও আমাদের মাথা ব্যথা নেই। আমাদের পেইজে আমরা কেবল কুলাউড়াকেই তুলে ধরবো। কুলাউড়ার সৌন্দর্য, এর সমস্যাগুলো, এবং তার সমাধান বের করার চেষ্টাও করলাম...
... বাবুর আইডিয়া আমার পছন্দ হলো। এ ব্যপারে শুরু হলো বিস্তর আলোচনা। সবকিছু প্ল্যান করা হয়ে গেলেও আমরা আটকে গেলাম নামে! পেইজের কী নাম দেয়া যায়, যা মানুষ পছন্দ করবে, মনে রাখবে, আর নাম থেকেই ধারণা করে নিতে পারবে আমাদের উদ্দেশ্য। সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত চলে এলো, আলোচনাও তাই সেখানে অসমাপ্ত রেখে আমি আর বাবু যে যার বাড়ি চলে গেলাম।
এর পরদিন থেকে বাবু প্রতিদিনই কল দিতো। অনেক আশা নিয়ে নাম চাইতো। আমি প্রতিদিনই তাকে আশাহত করতাম।
পরের সপ্তাহে যখন বাড়ি এলাম, বাবু আমাকে কুলাউড়া জংশনের ৩ নাম্বার প্ল্যাটফর্মে ডাকলো। শেষ বিকেলে বের হলাম। এখনও মনে আছে, অসম্ভব গরম ছিলো সেদিন। গরমের সন্ধ্যায় দু কাপ চা নিয়ে রেললাইনের উপর এসে দাঁড়ালাম। বাবু বললো, নাম পেয়েছি। "অনুলিপি কুলাউড়া"। আমি তার কাছে এই নামকরণের কারণ জানতে চাইলাম। সে বললো, পুরো কুলাউড়াকে অনুলিপি করে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কুলাউড়ার মানুষের কাছে কুলাউড়া প্রতিলেপন করবো। এজন্য এই নামের চেয়ে ভালো কিছু আর হয় না। কৈফিয়তটা আমার মনে ধরলো।
ঠিক করা হলো ২০১৮ সালের জানুয়ারী মাসের প্রথম দিনে আমাদের পেজ খোলা হবে। এর আগে প্রায় দুইমাস ধরে নেয়া হলো নানা প্রস্তুতি। আমাদের প্ল্যানে যুক্ত হলো আমাদের আরেক বন্ধু হাবিবা ইসলাম ইমা।
২০১৮ সালের পহেলা জানুয়ারি অনুলিপি কুলাউড়া নামে একটি ফেসবুক পেইজ এবং একটি ফেসবুক প্রোফাইল খোলার মাধ্যমে শুরু হলো আমাদের যাত্রা। প্রথম কয়েকদিন কুলাউড়ার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানগুলোর কয়েকটা করে ছবি পোস্ট করা শুরু হলো। তারপর কুলাউড়ার বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো শেয়ার করা হতো পেইজ থেকে। মানুষজন ধীরে ধীরে চিনতে শুরু করলো কুলাউড়ার ফেসবুক জগতে নতুন এক নাম, "অনুলিপি কুলাউড়া"।
২০১৯ সালের পহেলা জানুয়ারি আমরা আমাদের প্রথম বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠান আয়োজন করলাম। খুবই ছোটখাটো একটা অনুষ্ঠান। ছোট্ট একটা কেক কেটে, গুটিকয়েক শুভাকাঙ্ক্ষী নিয়ে। প্রথম বছরে আমাদের অর্জন ছিলো পেইজে ৪৬০০ লাইক এবং ৪৬০০ মানুষের ভালোবাসা। দ্বিতীয় বছরে আমরা আমাদের কাজের ব্যাপ্তি একটু বাড়ালাম। কুলাউড়াকে নিয়ে বিভিন্ন ওয়েবসাইটের সংবাদগুলোর লিংক সরাসরি আমাদের পেইজ থেকে শেয়ার করা শুরু করলাম। বিভিন্ন ভিডিও কন্টেন্ট নিয়ে কাজ করাও শুরু করলাম এই বছরে। সিদ্ধান্ত হলো তৃতীয় বছরের শুরুতে একটি ইউটিউব চ্যানেলের সংযোজন হবে আমাদের।
![]() | |
| পহেলা জানুয়ারি ২০১৯ সালে তোলা ছবি। খুব ছোটখাটো আয়োজনে আমরা উদযাপন করেছিলাম আমাদের ৪৬০০ পেইজ লাইক এবং ১ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান। |
২০২০ সালের পহেলা জানুয়ারিতে কুলাউড়া পৌরসভার একটি ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলো অনুলিপি কুলাউড়া ইউটিউব চ্যানেলের। এই বছরটাতে আমরা বেশ নতুন কিছু কাজ করলাম। আমাদের হাত ধরে কুলাউড়াতে শুরু হলো ভিডিও প্রতিবেদন। আমরা আয়োজন করলাম কিছু প্রতিযোগিতা এবং গিভ-অ্যাওয়ের।
![]() | |
| দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দৃষ্টিনন্দন কেক। |
তৃতীয় বছরের শেষে আমদের পেইজের ফলোয়ার সংখ্যা বেড়ে গেলো আগের চেয়ে আরও আড়াই গুণ। তিরিশ হাজার ফলোয়ার নিয়ে শুরু হলো আমাদের চতুর্থ বর্ষ! এবারে আমরা গঠন করলাম একটি উপদেষ্টা পরিষদের। যেখানে সদস্য হিসাবে যুক্ত হলেন কুলাউড়ার বিচক্ষণ কয়েকজন মানুষ। এর পাশাপাশি ফেসবুক থেকে আমরা পেলাম মনিটাইজেশন।
চতুর্থ বর্ষ মূলত আমাদের চোখ খুলে দেয়ার বছর। চার বছর ধরে চলে আসা পথে আমরা অনেক ভাঙ্গা রাস্তা হেঁটে এসেছি। কিন্তু পঞ্চম বর্ষে পদার্পণের ঠিক ১ মাস আগে, অর্থাৎ ২০২১ সালের পহেলা ডিসেম্বর অনুলিপি কুলাউড়া এক্সপেরিয়েন্স করলো তার সবচাইতে খারাপ অভিজ্ঞতাটি!
হটাৎ করে পেইজের সব অ্যাডমিনদের এক্সেস চলে গেলো। পেইজ ডিলিটেশনে ফেলে আনপাবলিশ করে দেয়া হলো। আমাদের পেইজের একমাত্র ফেসবুক প্রোফাইলটি করে দেয়া হলো ডিজেবল্ড! আর এ সব কিছুই সংগঠিত হলো যার মাধ্যমে সে ছিলো আমাদের খুবই কাছের জন, আপনজন। যাকে একদম ছাঁই থেকে তুলে এনে দেয়া হয়েছিলো আমাদের সম্রাজ্যের চাবিকাঠি। দুই বছর কাজ করে সে হয়ে গিয়েছিলো অনুলিপি কুলাউড়ার একমাত্র মুখপাত্র। মানুষের কাছে আমার এবং বাবুর চেয়ে বেশি পরিচিত ছিলো সে। সবাই ভাবতো সে-ই অনুলিপি কুলাউড়ার হর্তাকর্তা। আমরাও মাথা ঘামাতাম না এতে। নিজের লোক-ই তো!
যাই হোক, আমার তাৎক্ষনিক কিছু উদ্যোগের কারণে সবকিছু অতি দ্রুত রিকোভার করা সম্ভব হলেও ঘরের শত্রু বিভিষণের এমন আচরণ আমাদের সকলকে স্তম্ভিত এবং মারাত্মকভাবে মানসিক বিপর্যস্ত করে ফেললো।
দুষ্টজনের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাকে নিরবে বের করে দেয়া হলো টিম থেকে এবং গৃহিত হল নতুন কিছু নীতিমালা!
২০২২ সালের জানুয়ারিতে বেশ জমকালো এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। পঞ্চম বর্ষে পদার্পণ, পঞ্চাশ হাজার ফলোয়ার পূর্তি, আর আমাদের নতুন সংযোজন নিজস্ব একটি ওয়েবসাইট! কুলাউড়ার গণ্যমান্য সকল ব্যাক্তিবর্গকে নিয়ে সফলতার সাথে শেষ করলাম সে আয়োজন।
| পঞ্চমবর্ষে পদার্পণ, পঞ্চাশ হাজার ফলোয়ার্স, নিজস্ব ওয়েবসাইট লঞ্চিং এর জমকালো আয়োজনের একটি দৃশ্য। |
আজ পাঁচ বছর পর আমরা পেছনে ফিরে তাকালে দেখতে পাই আমাদের হেঁটে আসা পথটাকে। মোটেও মসৃণ ছিলো না পথটা। তবে তীব্র মনোবল, কাজের প্রতি সততা, এবং অহিংস মনোভাবই আমাদেরকে আজ করে তুলেছে কুলাউড়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল! ২০২১ এ অশনী পেছনে ফেলে এসে ২০২২ সালটি আমাদের জন্য ছিলো প্রাপ্তির বছর।
![]() |
আমাদের উপদেষ্টা জনাব সালেহ্ আহমদ ভাইয়ের হাত থেকে গ্রহণ করছি আমাদের অফিসিয়াল ল্যাপটপ। |
এই বছরে আমাদের অর্জনগুলো তুলে ধরি এক নজরে,
* নিজস্ব একটি ক্লিন এবং অ্যাড বিহীন ওয়েবসাইট চালু করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। কোনো প্রকার প্রোমোশন ছাড়াই ওয়েবসাইট লঞ্চিং এর ৫ মাসের মধ্যে ১ লক্ষ ভিজিটর পাই আমরা। বর্তমানে আমাদের ওয়েবসাইটে মাসিক ট্রাফিক প্রায় ৩০ হাজার। যা একটি স্থানীয় নিউজ পোর্টালের জন্য অবিশ্বাস্য!
* সেপ্টেম্বরের শুরুতে আমাদের একজন উপদেষ্টার সৌজন্যে একটি উচ্চগতি সম্পন্ন ব্র্যান্ড নিউ ল্যাপটপ পেয়েছি আমরা। একাদশ প্রজন্মের কোর আই থ্রি প্রসেসর, আট গিগাবাইট র্যামের ল্যাপটপটি আমাদের কাজের গতিকে করছে আরও ত্বরান্বিত।
* সেপ্টেম্বরের শেষে আমরা পেইজে ৬০ হাজার ফলোয়ার অর্জন করতে সক্ষম হই, যার পুরোটাই অর্গানিক।
* অক্টোবরের শুরুতে আমরা নিজস্ব একটি দৃষ্টিনন্দন অফিস উদ্বোধন করি, যা ছিলো আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।
![]() | |
|
আসছে জানুয়ারিতে আমরা পা দিতে যাচ্ছি ষষ্ট বর্ষে। ছয় বছর বয়স মূলত স্কুলে ভর্তি হবার বয়স। যদিও আমরা শুরুর দিন থেকেই শিখে শিখে আসছি, ষষ্ট বর্ষে পদার্পণে অনুলিপি কুলাউড়ার প্রতি আপনার বিশেষ পরামর্শ কী? জানাতে পারেন কমেন্ট করে। ধন্যবাদ...
লেখকঃ
সহ-প্রতিষ্ঠাতা, অনুলিপি কুলাউড়া।




